October 13, 2026, 10:35 pm

News Headline :
সরকার-ব্যবসায়ীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব : প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির প্রতিবাদে বগুড়ায় মিছিল ও এনসিপি নেতা তানভীরের কুশপুত্তলিকা দাহ রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নির্ধারণের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রোটারি ক্লাব অব বগুড়ার ২৬তম অভিষেক অনুষ্ঠিত শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে এনসিপি‘র তানভীরকে সাময়িক অব্যাহতি, শোকজ বগুড়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত বগুড়ায় শহীদ জিয়া ফুটবল টুর্ণামেন্টের প্রথম রাউন্ড সমাপ্ত ছুটির দিনে রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা দেখতে নিজেই গাড়ি চালিয়ে সড়ক পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে উত্তপ্ত নেপাল, কারফিউ জারি পাকিস্তানে কয়লাখনিতে বিস্ফোরণে ৩২ শ্রমিক নিহত

মাটিতে আড়াল হয়ে হৃদয়ে ঠাঁই নিয়েছেন দেশনেত্রী

‘একজন আপসহীন নেত্রী চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন সংগ্রাম, সাহস ও আত্মমর্যাদার এক অমর ইতিহাস। বেগম খালেদা জিয়া আজ নেই, কিন্তু তাঁর জীবন ও লড়াই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাংলাদেশকে পথ দেখিয়ে যাবে-অন্ধকারে জ্বালিয়ে রাখবে প্রতিবাদের দীপশিখা। ’
বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে নিভে গেল আরেকটি দীপ্ত ধ্রুবতারা। আপসহীন নেত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন ও দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই।
দীর্ঘ অসুস্থতা, নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম আর নির্যাতনে এক ধাবমান জীবনের ইতি টেনে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। পরদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার, জানাজা ও দাফনের মধ্য দিয়ে কৃতজ্ঞ জাতি তাঁকে জানায় শেষ বিদায়।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়-এটি বাংলাদেশের চার দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেসব নারী নেতৃত্ব সাহস, দৃঢ়তা ও গণআস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের অগ্রভাগে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি ছিলেন আপসহীনতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, আধিপত্যবিরোধী সংগ্রামের এক অনমনীয় নাম। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষাজীবন কাটে দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহজীবনকে এনে দেয় এক নতুন বাঁক।
যে বাঁক তাঁকে ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে নিয়ে যায় ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সন্তানসহ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দিত্ব, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভয়ের দিনগুলো তাঁর জীবনে রেখে যায় গভীর ক্ষতচিহ্ন। কিন্তু সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতাই যেন তাঁকে ভবিষ্যতের কঠিন লড়াইয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবরণের পর শুরু হয় বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তখন বিপর্যস্ত, দেশ স্বৈরশাসনের কবলে।
একদিকে দলের ভাঙন, অন্যদিকে সেনাশাসকের দমনপীড়ন-এই দুর্যোগের মুখে একজন রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ গৃহবধূ দলের হাল ধরলেন। শুরু হলো এক অগ্নিপরীক্ষা।
মাঠে নামলেন কর্মীদের কাতারে দাঁড়িয়ে। পুলিশের লাঠি, গ্রেপ্তার, কারাবরণ-কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। প্রলোভন ও ভয়ের কাছে নত না হয়ে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন আপসহীন-যে শব্দটি একসময় তাঁর নামেরই সমার্থক হয়ে গেল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই পরিচয়ের সঙ্গে তিনি আপস করেননি। দীর্ঘ আট বছরের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বেই দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় সংসদীয় গণতন্ত্র-যা ইতিহাসে তাঁর এক অবিস্মরণীয় অর্জন। ১৯৯১-৯৬, ১৯৯৬ সালের স্বল্পস্থায়ী মেয়াদ এবং ২০০১-২০০৬ মোট তিনবার তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর নেতৃত্ব স্বীকৃতি পায়; ২০০৫ সালে বিশ্বখ্যাত ফোর্বস সাময়িকীর বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় স্থান পাওয়া তার প্রমাণ।
অন্যদিকে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় প্রতিহিংসার অন্ধকার অধ্যায়। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে শুরু করে পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একের পর এক মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করা হয়। শুধু তাঁকেই নয়, প্রতিহিংসার আগুন ছড়িয়ে পড়ে তাঁর পরিবারেও। বড় ছেলে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে ঠেলে দেওয়া হয় জীবনমৃত্যুর সীমান্তে। রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত না থাকা ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকেও রেহাই দেওয়া হয়নি- তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়। মমতাময়ী মা ও বড় ভাইয়ের জন্য অবিরাম উদ্বেগ, মানসিক যন্ত্রণা আর নির্বাসিত জীবনের ভার সইতে না পেরে প্রবাসেই নিভে যায় আরাফাত রহমান কোকোর জীবনপ্রদীপ-যা বেগম খালেদা জিয়ার হৃদয়ে এক অপূরণীয় ক্ষত হয়ে থাকে। এই দীর্ঘ নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় বিশেষভাবে নিষ্ঠুর এক দিন ছিল ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। সেদিন সম্পূর্ণ সাজানো মামলায় তাঁকে ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের নির্জন, অস্বাস্থ্যকর ও মানবতাবর্জিত কারাগারে প্রেরণ করা হয়-যেখানে একজন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নামিয়ে আনা হয়েছিল চরম অবমাননা ও নিষ্ঠুরতার গভীরে।
তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাগারে প্রবেশ করেন সুস্থ মানুষ হিসেবে, আর বের হন লিভারের দুরারোগ্য ব্যাধিসহ নানাবিধ রোগ নিয়ে। চিকিৎসাবঞ্চনা, মানসিক নির্যাতন ও লাগাতার অপমান তাঁর শরীরকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন-বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে স্লো-পয়জনিং করা হয়েছিল।
দীর্ঘ কারাভোগ ও গৃহবন্দিত্বের মধ্যেও তিনি রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে যাননি। তাঁর অবর্তমানে প্রবাস থেকে আন্দোলনকে সাফল্য দিতে প্রধান সেনাপতির ভূমিকা রাখেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমান।
২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া একে একে মিথ্যা মামলা থেকে খালাস পান। ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য প্রথমবারের মতো বিদেশে যান বেগম খালেদা জিয়া। লন্ডনে পৌঁছে বহুদিন পর পান পুত্রসান্নিধ্য, পুত্রবধূ ও নাতনিদের ভালোবাসা। চিকিৎসায় কিছুটা উন্নতি হলেও সময় যে অনেক দেরি হয়ে গেছে, তা তখনই স্পষ্ট ছিল।
লন্ডনে চিকিৎসায় শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয় এবং বড় ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপন করেন। ৬ মে দেশে ফেরার দিন বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রত্যাবর্তন ঘিরে নেমে এসেছিল জনতার ঢল।
২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে চিকিৎসকদের নিষেধ উপেক্ষা করে বেগম খালেদা জিয়া হাজির হন-চিরচেনা সেই অঙ্গনে। গুণগ্রাহীদের শ্রদ্ধায় বারবার তিনি হারিয়ে যাচ্ছিলেন ভিড়ে। এটিই ছিল তাঁর শেষ প্রকাশ্য উপস্থিতি।
২৩ নভেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে আবার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৩৭ দিনের জীবনমৃত্যুর লড়াই শেষে ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় তিনি পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে যায়।
এরপর ৩১ ডিসেম্বর সকালে লাল-সবুজে মোড়ানো কফিন যখন এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বের হয়, তখন অশ্রু আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। গুলশানের বাসভবন থেকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা-শেষবিদায়ের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল হৃদয়বিদারক।
ঢাকার ঐতিহাসিক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত জানাজায় জনসমুদ্রের ঢল নামে। দলমত-ধর্মবর্ণনির্বিশেষে লাখো মানুষ হাজির হয়। এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জানাজা বলে অভিহিত করছেন অনেকে। সংখ্যার বিচারে নয়, আবেগ ও ভালোবাসার গভীরতায়। ৩১ ডিসেম্বর সকাল ৯টার কিছুক্ষণ আগে এভারকেয়ার হাসপাতালের ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসে বেগম খালেদা জিয়ার লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। লাল-সবুজে মোড়ানো গাড়িটি বের হতেই চারপাশে নেমে আসে এক ভারী নীরবতা-চোখের পানি আর দীর্ঘশ্বাসে স্তব্ধ হয়ে যায় পরিবেশ। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে গাড়িবহর এগিয়ে যায় গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসভবনের দিকে। সেখানে মায়ের কফিনের পাশে বসে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতে মগ্ন ছিলেন বড় ছেলে তারেক রহমান। শোকস্তব্ধ পরিবারের নীরব শেষ শ্রদ্ধায় মুহূর্তগুলো হয়ে ওঠে আরও বেদনাবিধুর।
আতিকুর রহমান রুমন
আহ্বায়ক,আমরা বিএনপি পরিবার
সদস্য, বিএনপি মিডিয়া সেল

 

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © jamunanewsbd24.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD