October 13, 2026, 10:35 pm

News Headline :
সরকার-ব্যবসায়ীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব : প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির প্রতিবাদে বগুড়ায় মিছিল ও এনসিপি নেতা তানভীরের কুশপুত্তলিকা দাহ রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নির্ধারণের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রোটারি ক্লাব অব বগুড়ার ২৬তম অভিষেক অনুষ্ঠিত শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে এনসিপি‘র তানভীরকে সাময়িক অব্যাহতি, শোকজ বগুড়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত বগুড়ায় শহীদ জিয়া ফুটবল টুর্ণামেন্টের প্রথম রাউন্ড সমাপ্ত ছুটির দিনে রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা দেখতে নিজেই গাড়ি চালিয়ে সড়ক পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে উত্তপ্ত নেপাল, কারফিউ জারি পাকিস্তানে কয়লাখনিতে বিস্ফোরণে ৩২ শ্রমিক নিহত

সম্ভবনার ডানা মেলছে লামা উপজেলা

যমুনা নিউজ বিডি: ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে পাহাড় ও মাতামুহুরী নদী বেষ্ঠিত হওয়ায় দেশের অন্যান্য জেলার উপজেলার চেয়ে বান্দরবানের লামা উপজেলাকে পরোপুরি বৈচিত্রময় বলা চলে। বর্তমান সময়ে পর্বত, অরণ্য ও সমুদ্রপ্রেমী এ তিন শ্রেণির পরিব্রাজকদের জন্য সেরা গন্তব্য হচ্ছে লামা। মেঘাবৃত্ত পাহাড়, সবুজ উপত্যকার মায়াবী জনপদের নাম লামা।

কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু সারি সারি সবুজ পাহাড়, সেই সবুজ পাহাড়ে মেঘের আড়ালে হারিয়ে যেতে নেই মানা। প্রাকৃতি যেন তার সবটুকু রূপ ঢেলে দিয়েছে বান্দরবানের লামা’কে। এই সারি সারি সবুজ গালিচার ওপর আপনার আগমণে যোগ হবে ভিন্ন মাত্রা। উপজেলাটি যেন একটি সবুজ কার্পেটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যেদিকে দু’চোখ যাবে সবুজে সবুজে বর্ণিল, নতুন সাজে ধরা দেবে আপনার কাছে।

পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত না দেখলে প্রকৃতির যে বর্ণনাতীত সৌন্দর্যতা অনুভব করা যাবে না। তাইতো বর্ষায় মেঘ এবং শীতে কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ী পথ দিয়ে পাহাড়ের চুড়ায় উঠতে রোমাঞ্চকর এক অনুভূতি ঘিরে ধরবে আপনাকে। মাঝে মাঝে মনে হবে আপনি মেঘের রাজ্যে প্রবেশ করেছেন। শীতে সূর্য্যের আলো ফোটার আগে বুঝার কোন উপায় নেই এটি কোন জনপদ। সূর্যোদয়ের পর ভেসে উঠে জনপদ।

মিরিঞ্জা পাহাড় থেকে দেখা যাবে লামা শহর, পাশের সবুজ সুন্দর প্রকৃতি এবং পশ্চিমে তাকালে উপকূলীয় সবুজ বনানীর পর মাতারবাড়ি তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কুতুবদিয়া-মহেশখালী দ্বীপের বাইরে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান জাহাজ ও বোটগুলো যেন পাহাড়ী নদীর পানসি নৌকা। লামার প্রকৃতি সেজেছে রূপের ঢালা মেলে, চারপাশে চোখ জুড়ানো সবুজ, হঠাৎ মেঘ, হঠাৎ কুয়াশা। লামার বুকে বয়ে চলা মাতামুহুরী নদী যেন স্বপ্ন জগতে নিয়ে যাবে আপনাকে। মাঝে মধ্যে উঁচু উচু পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে উকি দেয় সূর্য্যরে আলো। প্রকৃতির কাছাকাছি আসার, বুক ভরে নির্মল বাতাস নেয়ার, আর স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে চোখ জুড়ানোর একমাত্র জায়গা লামা। লামায় রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। অরণ্য রাণী খ্যাত লামার মিরিঞ্জা পাহাড়, সুখীয়া পাহাড়, দু:খীয়া পাহাড় এবং আশপাশের এলাকায় আবিস্কার হয়েছে শতাধিক পর্যটন স্পট। যুব সমাজ এ পর্যটন শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। দূর্গম সব পাহাড় পর্বত আর প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে অনেক স্থানই লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে। সেগুলো ভ্রমন উপযোগী করতে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। এক সময়ের দুর্গম পাহাড়ি লামা বর্তমানে কোলাহলপূর্ণ বিকাশমান পর্যটন শহর।

মিরিঞ্জা :-
এই জায়গাটি ইতোমধ্যে দেশজুড়ে পর্যটকদের মধ্যে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে। উপজেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন “মিরিঞ্জা পর্যটন কমপ্লেক্সে”। মিরিঞ্জা নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক পর্যটন স্পট। পাহাড়টি ভূ-পৃষ্ট থেকে প্রায় ১৬০০ ফুট উঁচু। “মিরিঞ্জা” পর্যটন স্পট থেকে সাগর, পাহাড়, আকাশ ও হরেক রকমের পাখি দেখা যায় দু‘নয়ন ভরে। যার ওপর রয়েছে নীল আকাশে মেঘের বিচরণ। প্রতিনিয়ত মেঘ ছুঁয়ে যায় মিরিঞ্জা পাহাড়ের গা, দৃষ্টি নন্দন টাইটানিক ভিউ পয়েন্ট, ওয়াকওয়ে ও মিনি শিশু পার্ক। মিরিঞ্জা পর্যটন কমপ্লেক্সের গোড়াপত্তন হয়েছিল ২০০৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখ প্রায় ৩৩ একর পাহড়ি ভূমিকে ঘিরে।

সুখীয়া এবং দুঃখীয়া ভ্যালি :-
মাতামুহুরী নদীর দুই তীরে সুখীয়া এবং দুঃখীয়া ভ্যালির অবস্থান। নয়ন জুড়ানো সবুজ স্নিগ্ধ বনানী ঘেরা সুখীয়া এবং দুঃখীয়া পাহাড়ের বুক চিড়ে সর্পিলাকার বহমান মাতামুহুরী নদী। সুখীয়া এবং দুঃখীয়া পাহাড়ের উঁচু চুড়ার মনোরম দৃশ্যের সমারোহ দেশি-বিদেশের ভ্রমন বিলাসী পর্যটকদের হৃদয়কে মোহিত করেছে। এ দুই পাহাড়ের চুঁড়ায় উঠলে মনপ্রাণ ফুরফুরে হয়ে যাবে।

ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস অন্যান্য জেলার চেয়ে তিন পার্বত্য জেলা সম্পূর্ণ আলাদা। অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গেলে দেখা যায় ভৌগোলিক কারণে এখানকার জীবন ও জীবিকা সমতলের চেয়ে অনেক কঠিন ও কষ্টসাধ্য। এ উপজেলায় বসবাসরত নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর রয়েছে আলাদা ভাষা ও সংস্কৃতি। অধিকাংশ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এ পেশার লোকজনকে ‘জুমিয়া’ বলা হয়। জুম চাষ মুলত: মাল্টি এগ্রিকালচার। একই জায়গায় বহু ফসলের চাষ করা হয় এবং একটির পর একটি ফসল উত্তোলনের মধ্যে দিয়ে একটি বছর সমাপ্তি হয়। সাধারণত পৌষ-মাঘ মাসে জুম চাষের জন্য জঙ্গল কাটা হয়। চৈত্র মাসে জুমের কর্তিত জঙ্গল আগুনে পোড়া হয়। বৈশাখ মাসে ভস্মীভূত হয়নি এমন গাছের কঞ্চি, বাঁশ, লতা ইত্যাদি পরিস্কার করা হয়। বৈশাখ মাসের শেষে বীজ বপন শুরু হয় এবং জৈষ্ঠ্য মাসের মধ্যে বীজ বপনের কাজ সম্পন্ন করা হয়। জুমে চাষ করা ফসলগুলো হলো- ধান, কাউন ধান, জব, তুলা, আদা, হলুদ, ঘষ্যা, মার্ফা (এক ধরণের শশা), মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, তিল, মরিচ, ভুট্টা এবং চুকাই বা চুকুর বা মেস্তা বা টক ফল (সিলেটে হইলফা যা ইংরেজিতে রোজেলা) চাষ করে থাকে। জুমিয়ারা বাগান পাহারা দেওয়া এবং ফসল সংগ্রহের জন্য জুম বাগানে বাঁশ এবং ছন দিয়ে ‘জুমঘর’ তৈরী করে থাকে। এ জুমঘরকে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায় “প্রবাস্যা ঘর”, ম্রো ভাষায় “ঐবক”, মার্মা ভাষায় “বাও”, ত্রিপুরা ভাষায় “হুৎমাইঞা” এবং বাংলা ভাষায় যাকে “জুমঘর” বলে।

বর্তমান সময়ে প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে এ জুমঘর খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে পর্যটকদের মধ্যে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে “জুমঘর”। পর্যটকদের কাছে লামা আজ এক স্বপ্নরাজ্যে। মিরিঞ্জা পাহাড়, সুখীয়া-দুঃখীয়া পাহাড় এবং আশপাশের এলাকার নয়নাভিরাম পর্যটন স্থানগুলো ভ্রমন পিয়াসু পর্যটকদের প্রতিনিয়ত আকৃষ্ট করে থাকে। লামায় পর্যটকদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি পাহাড়ী সংস্কৃতি ও জুম চাষের সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয় এবং প্রকৃতি ও ঐতিহ্য প্রেমী পর্যটক সহজেই পাহাড়ি সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে এ উপজেলার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন হচ্ছে।

জুমে চাষ করা চুকাই বা চুকুর বা মেস্তা বা টক ফল যার বৈজ্ঞানিক নাম রোজেলা। রোজেলা পাট প্রজাতিয় গাছ। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এশিয়াতে এটির চাষ শুরু হয়। এটি পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী পাহাড়ী বাঙ্গালীদের পছন্দের একটি খাবার। রোজেলা ফল ভিটামিন-সি দ্বারা ভরপুর। এখন অনেকে রোজেলা দিয়ে জ্যাম ও জেলি তৈরী করছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউট সম্প্রতি রোজেলা চা বানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মিশরসহ আফ্রিকার অনেক দেশে এ চা দিয়ে অতিথিকে আপ্যায়ন করা হয়। রোজেলা ফল কসমেটিক এবং সাবান তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। এটি এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে। লামা আসা পর্যটকগণ সাথে রোজেলার সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে।

যেভাবে লামায় হবে আপনার পদার্পন :-
লামায় যাওয়ার জন্য প্রথমত রাজধানী ঢাকার রাজারবাগ, ফকিরাপুল বা সায়েদাবাদ থেকে হানিফ কিংবা শ্যামলী এন আর ট্রাভেলস বাসে করে সরাসরি লামায় যেতে পারবেন। এছাড়াও কক্সবাজারগামী যে কোন বাসে যোগে চকরিয়া বাস টার্মিনালে অথবা কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রেলপথে চকরিয়া নেমে চকরিয়া বাস টার্মিনালে এসে জিএনজি, জীপগাড়ী (চাঁদের গাড়ি) এবং বাস যোগে মিরিঞ্জা বাজারে নেমে ১০ মিনিট হাঁটার দূরত্বে মিরিঞ্জা ভ্যালির অবস্থান।

ভ্রমণকালীন সতর্কতা :-
১। সার্বিক নিরাপত্তার প্রয়োজনে কিছু জায়গায় চেকিং হতে পারে। তাই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পেশাগত বা ইউনিভার্সিটির পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে।
২। পাহাড়ের উপর নির্বিঘ্নে চলাফেরা কারা জন্য ভালো গ্রিপসহ জুতা পরতে হবে।
৩। টর্চলাইট, ওরস্যালাইন, দড়ি, প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সঙ্গে রাখতে হবে। কাধের ব্যাগ যেন খুব বেশি ভারী হয়ে না যায়।
৪। ভ্রমনের জন্য গাইড নিয়োগের পাশাপাশি, বৃষ্টিরত অবস্থায় পাহাড়ী ঝর্ণাগুলো পরিহার করতে হবে।
৫। আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। তাদের জীবনযাত্রা ও সাংস্কৃতিক কৃষ্টিকালচার আলাদা। তাই তাদের সামাজিক মূল্যবোধে আঘাত করে এমন কোন কাজ করবেন না।
৬। দেশটা আমাদের, যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের দেশের সম্পদ। তাই কোথায় ঘুরতে গেলে খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল এবং ময়লা আবর্জনা করা থেকে বিরত থাকুন। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সহায়তা করুন।
৭। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় সন্ধ্যার পর রাত্রিযাপনের স্থানের আশপাশে থাকবেন। সন্ধ্যার পর নিরিবিলি অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকা পরিহার করাই উত্তম।
৮। হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণে যাওয়ার পূর্বে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জেনে নিতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © jamunanewsbd24.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD